সাপে কামড়ালে প্রাথমিক চিকিৎসা
সাপে কামড়ালে প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জানা প্রত্যেকটি মানুষের জন্য
খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়কে সামনে রেখে আমাদের আজকের
আর্টিকেলের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। সাপের কামড়ে যাদের আক্রান্ত হওয়া
সম্ভবনা বেশি, কামড়ানোর সময়কাল, উপসর্গ, যা করণীয়, যা করা যাবে না, সাবধানতা,
কুসংস্কার ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। অতএব আর্টিকেলটি শুরু থেকে
শেষ পর্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়ুন।
সাপ একটি আতঙ্কিত জীবের নাম। যার বৈজ্ঞানিক নাম হল naja naja .আচমকা সাপের নাম শুনলে সবারই গা শিউরে ওঠে। সাপের কামড়ে প্রতিবছর অনেক মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে। সচেতনতার অভাব , সঠিক চিকিৎসা বা চিকিৎসা নিতে দেরি করার কারণেই আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিষধর সাপের কামড়ে মারা যায়।
সূচীপত্র ঃ সাপে কাটার প্রাথমিক চিকিৎসা
- সাপের আবাসস্থল
- বিষাক্ত সাপ
- যাদের সাপের কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি
- সাপের কামড়ের সম্ভাব্য আক্রান্তকাল
- সাপের কামড় সনাক্তকরণ
- উপসর্গ বা লক্ষণ
- বিষধর সাপে কামড়ালে প্রাথমিকভাবে যা করবেন
- সাপে কামড়ালে যা করা যাবে না
- কিভাবে সাপের কামড় থেকে সাবধানতা অবলম্বন করব
- সাপ নিয়ে কিছু কুসংস্কার
- রাসেলস ভাইপার সম্বন্ধে সঠিক ধারণা
- সাপে কাটলে কি করবেন :শেষকথা
সাপের আবাসস্থল
বিষাক্ত সাপ
বিষাক্ত সাপের আবাসস্থল সাধারণত ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এছাড়াও আফ্রিকার জঙ্গলে, বিভিন্ন পাহাড়িও অঞ্চলও বিষাক্ত সাপের বসবাস। ভৌগোলিকভাবে আমাদের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। দক্ষিণ এশিয়ায় কয়েক শতাধিক প্রজাতির সাপের বসবাস। বাংলাদেশেও অনেক প্রজাতির সাপ রয়েছে।
আরো পড়ুনঃ ব্লগে আর্টিকেল লেখার নিয়ম
আমাদের দেশে যেসব সাপ রয়েছে তার বেশিরভাগই তেমন বিষাক্ত নয়। তন্মধ্যে যে সকল সাপ খুব বিষাক্ত তা হলো গোখরা বা কোবরা , চন্দ্রবোড়া বা রাসেল ভাইপার , শঙ্খিনী বা শাঁকিনী ও সবুজ বোড়া বা বাঁশ বোড়া অন্যতম। সাপে কামড়ালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন যাপন করা যায়। সুতরাং সাপে কামড়ালে ভীত না হয়ে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিন।
যাদের সাপের কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি
যাদের সাপে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি তারা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রেখে চলাফেরা করলে সাপের কামড় থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজতর হবে। বর্ষাকাল এলেই বেড়ে যায় বিষাক্ত সাপের আনাগোনা । গ্রীষ্মকালেও প্রচণ্ড গরমের কারণে সাপ বাইরে ,রাস্তায় , আদ্র স্থানে ঘাপটি মেরে বসে থাকে।
- যারা বিভিন্ন ট্যুরে যান কিংবা বর্ষায় বনে পাহাড়ে ঘুরতে বা কাজে যান ।
- শিশুরাও বাইরে বন্ধু-বান্ধবের সাথে খেলতে গেলে ,এমনকি স্কুলে যাতায়াত করার সময়ও আক্রান্ত হতে পারে ।
- কৃষি জমিতে কাজ করার সময় ।
- রাতের আধারে অসাবধানতা বশত চলাফেরা করার সময় ।
- লাকড়ির স্তূপ , বাসার মধ্যেে অব্যবহৃত আস্তানায় চুপটি করে সাপ বসে থাকে। সুতরাং বাসা পরিষ্কারের কাজ করতে গিয়ে মা-বোনেরা সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে থাকে ।
সাপের কামড়ের সম্ভাব্য আক্রান্তকাল
সাপের কামড় সনাক্তকরণ
উপসর্গ বা লক্ষণ
- বিষধর সাপ কামড়ালে দংশিত স্থান ফুলে যাবে ।
- রক্ত গড়িয়ে পড়বে ।
- চোখের উপরের পাতা বুজে আসবে বা খুব ক্লান্তি বা ঝিমুনি ভাব আসবে।
- প্রসবের পরিমাণ কমে যাবে এবং রং কালো দেখাবে ।
- বিষ ছড়িয়ে পড়লে বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে ।
- শরীর আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে যায় এবং প্রচন্ড জ্বর সহ কাঁপুনিও আসতে পারে।
- বিষধর সাপে কামড়ালে জ্বালাপোড়া বাড়তে থাকে ও আক্রান্ত স্থানের চারপাশ লাল হয়ে যায় ।
- ত্বকের রং পরিবর্তন হয় এবং অক্সিজেনের অভাবে নিলাভ আকৃতি ধারণ করে।
- ডায়রিয়া ,পেটব্যথা ,মাথাব্যথা হতে পারে ।
- হার্টবিট বেড়ে যায় ।
- ক্লান্তিবোধ ও পেশিতে দুর্বলতা অনুভব হবে ।
- তৃষ্ণাবোধ বা পানি শূন্যতা বেড়ে যাবে ।
- নিম্ন রক্তচাপ ইত্যাদি অন্যতম ।
বিষধর সাপে কামড়ালে প্রাথমিকভাবে যা করবেন
- রোগীকে আতঙ্কিত না করে যথা সম্ভব আশ্বস্ত করবেন এবং শান্ত রাখবেন ।
- সাপের কামড়ের স্থানটি যেন নড়াচড়া না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে ।
- ক্ষত স্থান সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে ।
- আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার সুতি কাপড় বা ব্যান্ডেজ বা গজ কাপড় দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে বেঁধে দিবেন । যেন আক্রান্ত স্থানের নড়াচড়া কম হয়। সেজন্য প্রয়োজনে স্প্রিন্ট বা শক্ত বাঁশের বাতা বা ওড়না ,গামছা ,চাদর ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে । এই হালকা চাপ দিয়ে বাঁধাকে ইমোবিলাইজেশন বলে ।
- আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতস্থানের কোন অঙ্গে যদি ঘড়ি ,বেসলেট ,আংটি ,চুরি ,বালা বা অন্য যেকোনো অলংকার থাকে যত দ্রুত সম্ভব খুলে ফেলতে হবে ।
-
যদি রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তবে আর একজন মুখে শ্বাস দেওয়ার ব্যবস্থা
করবেন । একে মাউথ টু মাউথ ব্রিডিং বলে ।
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে মাথার দিকে উঁচু করে শুইয়ে দিতে হবে যাতে আক্রান্ত স্থানটি হার্ট লেভেলের নিচে থাকে ।
- সাপটি মেরে ফেললে তা সংরক্ষণ করুন অথবা সাপটি দেখতে কেমন তা লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে পরবর্তীতে চিকিৎসার পরিকল্পনায় সহায়ক হয়।
-
বিষধর সাপে কামড়ালে প্রাথমিকভাবে যা করবেন তা হলো যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে
মোটরযানে করে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। যেখানে বিষ প্রতিষেধক বা
এন্টিভেনোম বিনামূল্যে পাওয়া যায় এমন কোন সরকারি হসপিটালে। যেমন ঃ
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ,সদর বা জেলা হসপিটাল ।
সাপে কামড়ালে যা করা যাবে না
- কোন গিট বা শক্ত করে বাঁধন দেয়া যাবে না ।
- কোনভাবেই ভয় পাওয়া যাবে না ।
- কবিরাজ বা ওঝার কাছে চিকিৎসা নেয়া যাবে না ।
-
ক্ষতস্থানে গরম বা ঠান্ডা সেক না দেয়া ।
- কামড়ানো স্থান ব্লেড ,ছুরি ,চাকু ,সুই ইত্যাদি দিয়ে কাটাকুটি করা যাবে না ।
- আক্রান্ত স্থান থেকে মুখ লাগিয়ে চুসে বিষ বের করা যাবে না ।
- কোন ভেষজ ঔষধ ,লালা ,পাথর ,উদ্ভিদের বীজ / রস , গোবর ,কাদা , স্যাভলন , পেস্ট , ঝুল বা কোন রাসায়নিক পদার্থ লাগানো যাবে না ।
- কোনভাবেই এমন কিছু খাবার বা ওষুধ দিবেন না যাতে বমি হয়। কারণ প্রচলিত আছে বমি করালে শরীরে বিষের পরিমাণ কমে যায়। এমনকি কোনোভাবেই বমি করানোর চেষ্টাও করানো যাবে না।
- ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিন জাতীয় কোন ওষুধ খাওয়াবেন না।
- ভুক্তভোগীকে হাঁটতে দেয়া যাবে না।
- আক্রান্ত স্থান নাড়াচাড়া করা যাবে না করে স্থির রাখবেন।
- ঝাড় ফোকের জন্য সময় নষ্ট করা যাবে না।
কিভাবে সাপের কামড় থেকে সাবধানতা অবলম্বন করব
- বন জঙ্গল ঝোপঝাড় লতাপাতা ইত্যাদি আছে এমন জায়গা পরিহার করে চলাফেরা করা । একান্ত প্রয়োজনে যেতে হলে সাবধানে যেতে হবে ।
- বন জঙ্গল বা ঝোপঝাড়ে হাটতে হলে প্রয়োজনে গাম্বুট পড়ে হাঁটুন ।
- কৃষি জমিতে কাজ করতে হলে প্রয়োজনে হ্যান্ড গ্লাভস পড়ুন ও চারপাশে সজাগ দৃষ্টি রাখুন ।
- বাড়ির চারদিক পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন ।
- যখনই বাইরে থাকবেন শিশুদের সাবধানে রাখবেন ।
- রাতের আঁধারে বাইরে গেলে অবশ্যই টর্চ লাইট বা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখবেন ।
- বিশধর সাপের কামড় থেকে পরিত্রাণ পেতে রাতে শোয়ার সময় মশারী টাঙিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি করুণ ।
- কখনোই গর্তের মধ্যে হাত ,পা ঢুকাবেন না।
- আপনার বসতবাড়ি বা শোবার ঘরের সাথে কোনও প্রাণী বা খাবার সামগ্রী রাখবেন না। যেমন খড়ের গাদা , ধান ,চাল হাঁস-মুরগি , কবুতর এসব ইঁদুরকে আকর্ষণ করে যার খোঁজে সাপ আসতে পারে।
সাপ নিয়ে কিছু কুসংস্কার
- কুসংস্কার> সাপ খুবই হিংস্র প্রাণী।
- সঠিক>সাপ নিরীহ প্রাণী ।
- কুসংস্কার>সাপ তেড়ে এসে কামড় দেয়।
- সঠিক> সাপকে কেবলমাত্র উত্তপ্ত করলেই কামড় দেয়।
- কুসংস্কার> রাসেলস ভাইপার দংশনে বেশিরভাগ রোগী মারা যায়।
- সঠিক>রাসেল ভাইপার দংশনে বেশিরভাগ রোগীই সুস্থ হয়ে ওঠে।
- কুসংস্কার> উপজেলা হসপিটালে চিকিৎসা সম্ভব নয় ।
- সঠিক> বেশিরভাগ উপজেলা হসপিটালের চিকিৎসা দিচ্ছেন বা চিকিৎসা শুরু করে রেফার করছেন।
- কুসংস্কার> সাপে কামড়ানো রোগীর আই সি ইউ প্রয়োজন।
- সঠিক> সাপে কামড়ালে প্রাথমিক চিকিৎসায় বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে যায়। বেশিরভাগ রোগীর আই সি ইউ দরকার হয় না । তবে কোন কোন রোগীর ক্ষেত্রে আই সি ইউ প্রয়োজন হতেও পারে।
- কুসংস্কার> সাপ কামড়ানোর ১০০ মিনিটের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
- সঠিক> সময় খুবই মূল্যবান। যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করতে হবে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা গেলে এন্টিভেনাম দিতে হবে সেটা কয়েক মিনিট ,কয়েক ঘন্টা বা কয়েকদিন পরে হলেও।
- কুসংস্কার> অ্যান্টি ভেনাম এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া আছে।
- সঠিক> পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে তবে তা অনেক কম
এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url