মাহে রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং আমাদের করণীয়

পবিত্র রমজান মাস সারা বছরের শ্রেষ্ঠ মাস। যা মুসলমানদের জন্য আল্লাহর রহমতের বারিধারায় জীবনকে সিক্ত করে তোলে। এই মাসটি হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মহান মাস যা রহমত, বরকত ও মাগফেরাতে পরিপূর্ণ। আজকে আমরা পবিত্র মাহে রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ্‌।
digital-dream-it


 

আমাদের বর্ণনা এ পবিত্র রমজান মাসের মহত্বকে ছুঁতেও পারবে না। এ মাসটি এতই রহমতে পরিপূর্ণ যে আমাদের ভাষাও এর রহমত, বরকত ও মাগফেরাতের বর্ণনা করে শেষ করতে পারবোনা, পারা সম্ভবও নয়। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসটিকে "শাহরুন আজিম" এবং "শাহরুম মোবারক" নামে অভিহিত করেছেন। 
 

সূচীপত্রঃ রমজান মাস মুমিনকে পুতপবিত্র করার মাস

রমজান মাসঃ গুরুত্ব ও ফজিলত

শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট বা বিভ্রান্ত করার জন্য তাদের দেহের মধ্যে এমনভাবে বিচরণ করে যেমন দেহের মধ্যে রক্ত চলাচল করে। সেই কারণেই মানুষ দিন রাত গুনাহে লিপ্ত হতে থাকে। হাত, পা, চোখ, কান, জিহবা এমনকি কলব বা দিল কোনটাই গুনাহ থেকে মুক্ত হতে পারেনা। এ সম্পর্কে আল্লাহর নবী করিম (সাঃ) বলেছেন "মানুষের জিহবা তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপের কারণ হয়"। সেজন্য এ সমস্ত গুনাহ থেকে পবিত্রতা অর্জন করা প্রয়োজন যাতে মানুষ দুনিয়া থেকে পবিত্র হয়ে বিদায় গ্রহন করতে পারেন। 

পৃথিবীর কোন মা যেমন তার আদরের সন্তানকে আগুনের কুন্ডলীতে পড়তে দিতে চায় না, তেমনি আল্লাহ তা'আলাও কোন বান্দাকে দোজখে নিক্ষিপ্ত হোক সেটা তিনি কখনোই কামনা করেন না। বান্দার প্রতি তার ভালোবাসা শিশুর প্রতি মায়ের স্নেহের তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি। মূলত গুনাহ থেকে পবিত্রতা অর্জন এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য মুসলিম উম্মাহকে রমজানের রোজা উপহার দেওয়া হয়েছে। সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে তাদের জন্য এটি এক মহামূল্যবান উপহার।

সুস্বাস্থ্য ও সবল অবস্থায় পুনরায় মাসটি ভাগ্যে জুটা সৃষ্টিকর্তার এক চরম অনুগ্রহ ছাড়া অন্য কিছুই নয়। তাই আল্লাহ তা'আলার নিয়ামতের শোকর আদায় করা কঠিন। এক্ষেত্রে শোকর আদায় করার প্রকৃত পন্থা হল সঠিক নিয়মে এ মাসে রোজা রাখা সহ যাবতীয় ইবাদত পালন করা। মনে রাখতে হবে দিনের বেলায় খানাপিনা করা, কামনা বসানা থেকে বিরত থাকা এবং সেই সাথে দেহের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুনাহ থেকে সংযত রাখার নামই হচ্ছে রোজা। আর এটিই মূলত রোজার লক্ষ্য।

  • আল্লাহপাক রমজানে তার বান্দাদের জন্য অনুগ্রহের ভান্ডারকে মুক্ত করে দেন। 
  • সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। 
  • জান্নাতের সকল দরজা সমূহ খুলে দেন এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেন। 
  • শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে দেন। যাতে করে তার বান্দাগণ শয়তানের ওসঅয়াসা থেকে মুক্ত থেকে সকল আমল সঠিকভাবে, সঠিক নিয়মে ও সঠিক সময়ে, নিরভুল্ভাবে করতে পারেন।
  • রোজাদারের প্রত্যেকটি নেকি নেক আমলের সাত শত গুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করেন 
  • প্রত্যেক রাতের বেলায় দুনিয়ার আকাশে আল্লাহ তা'আলা নেমে এসে তিনি এই বলে বান্দাদেরকে ডাক দেন যে, 
      • কে আছো আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে ক্ষমা করব। 
      • কে আছো আমার কাছে দোয়া চাইলে তার দোয়ায় সাড়া দেব। 
      • কে আছো আমার কাছে কিছু চাইলে তাকে আমি সেটা অবশ্যই দেব। 
এভাবে রমজানের গুরুত্ব ফজিলত সম্পর্কে আরো বহু কথা উল্লেখ রয়েছে।
  • এগুলো ছাড়াও রোজাদারের জন্য আরো পুরস্কার রয়েছে যা মানুষকে জানানো হয়নি। এ প্রসঙ্গে নবী করীম সাঃ এরশাদ করেন আল্লাহ পাকের কাছে রমজানের এমন কিছু বহু পুরস্কার সংরক্ষিত রয়েছে যে, মানুষ যদি সে সম্পর্কে জানত তবে তারা সারা বছর রমজান কামনা করতো। কাজেই যে এ মাসের সুযোগের সদ ব্যবহার করল সে হল খুশনসিব আর যে মানুষ গুনাহের কাজে ব্যয় করল সে হলো চরম বেনসিব।
  • বস্তুত রমজান মাস হচ্ছে আল্লাহর রহমত ও দয়া অনুগ্রহের মাস। 
  • রমজান মাস হচ্ছে বান্দার গুনাহ মাফ পাওয়ার মাস।
  • রমজান মাস হচ্ছে দোযখের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়ার মাস।
  • রমজান মাস হচ্ছে অধিক নেকি কামাই করার মাস। এ মাসে একটি ফরজ অন্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান এই মাসে একটি নফল অন্য মাসের একটি ফরজের সমান। 
  • রমজান মাস সবর ও ধৈর্যের মাস। আর সবর ধৈর্যের পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত। 
  • রমজান মাস মানুষের প্রতি দরদ ও সমবেদনার মাস। যে ব্যক্তি এ মাসে তার গোলামের কাজের বোঝা হালকা করে দেবে আল্লাহতালা তাকে মাফ করে দিবেন , জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করে দিবেন। 
মাহে রমজানের বরকত ও কল্যাণের এসকল কথাগুলো হাদিস শরীফে বর্ণিত রয়েছে।
  • হাদীস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে এ মাসে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। 
  • যে ব্যক্তি এ মাসে কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে ওই উসিলায় তার গুনাহ মাফ করা হবে। জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে এবং ওই রোজাদার এর সওয়াবের সমান সওয়াব সেও লাভ করবে অথচ রোজাদারের সওয়াব মোটেই কমবে না। এমনকি সামান্য খেজুর কিংবা এক ঢোক পানি কিংবা এক চুমুক দুধ দিয়ে ইফতার করালেও ওই ব্যক্তি এই ফজিলত হাসিল করবেন।
  • হাদিস শরীফে একথা ও বর্ণিত হয়েছে যে, যে ব্যক্তি রোজাদারকে পানি পান করাবে আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তাকে হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করাবেন এবং কেয়ামতের সেই বিভীষিকাময় ময়দানে জান্নাতে যাওয়া পর্যন্ত সে কখনো আর পিপাসার অনুভব করবে না।

সওম বা রোজা কি? রোজা ফরজ হওয়ার দলিল

সওম শব্দের অর্থ বিরত থাকা। খাবার খাওয়া, পান করা, কামনা বাসনা এমনকি নিজ স্তী সহবাস করা এবং অন্যান্য পাপাচার থেকে বিরত থাকা মূলত রোজা। আরেকভাবে বলা যায় দিনের বেলায় খানাপিনা করা, কামনা বসানা থেকে বিরত থাকা এবং সেই সাথে দেহের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুনাহ থেকে সংযত রাখার নামই হচ্ছে রোজা।
সওম ফরজ হওয়ার ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসের উদ্ধৃতি দলিলঃ-
হে ঈমানদারগণ তোমাদের উপর রোজা কে ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পরবর্তী উম্মত গণের প্রতি যেন তোমরা পরহেজগারী বা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। সূরা বাকারা ১৮৩
কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে সে যেন রমজান মাসে রোজা রাখে। সূরা বাকারা ১৮৫

রমজান মাসঃ গুরুত্ব ও ফজিলতের কারণ

শুক্রবার যেমন সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন অনুরূপ রমজান হচ্ছে বছরের শ্রেষ্ঠ মাস। পবিত্র কোরআন নাজিলের কারণে এ মাসের মর্যাদা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এ মাসে সোয়াব ও ফজিলত লাভের জন্য ঈমানদারগণ সর্বদা চেষ্টায় থাকেন। ব্যবসার মৌসুমে বেশি মুনাফার জন্য ব্যবসায়ীরা যেমন দিনরাত একাকার করে পরিশ্রম করেন তদ্রুপ ঈমানদাররা পরকালের নাজাত ও চিরস্থায়ী জান্নাত লাভের আশায় এই মাসে কোমর বেঁধে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন নেকি অর্জনের উদ্দেশ্যে।

মোহাম্মদ সাঃ ও মনীষীদের পবিত্র মাহে রমজানের প্রস্তুতি যেমন ছিল

হুজুরে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান শুরুর ২ মাস আগেই অর্থাৎ রজব মাস থেকেই এই দোয়া করতে থাকতেন যে, "হে আল্লাহ রজব ও শাবান মাসকে আমার জন্য বরকতময় বানাও এবং  রমজান আমার ভাগ্যে নসিব কর।" অর্থাৎ রমজান মাস যেন আমরা পেতে পারি রমজানের বরকত, ফজিলত, কল্যাণ থেকে আমরা যেন বঞ্চিত না হই। 

শাবান মাস এসে গেলেই মহানবী সাঃ রোজা রাখা শুরু করতেন। তিনি এ মাসে এত বেশি ও এমন ভাবে রোজা করতেন মনে হয় যেন আর কখনো তিনি রোজা ভঙ্গই করবেন না। অতীতের বিভিন্ন মনিষীগণ রমজানের অন্তত ছয় মাস আগে থেকে রমজান মাস নসিব হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। সেই সঙ্গে গত রমজানে যাবতীয় ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য তারা মোনাজাত করতেন।

রমজান মাস অন্যান্য উম্মত হতে যেভাবে আলাদা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতকে রমজান মাসে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে দান করা হয়েছে। যা পূর্ববর্তী উম্মতদের নসিব হয় নাই ।

  • রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার নিকট মিশকে আম্বরের ঘ্রাণের চাইতেও বেশি প্রিয়। 
  • রোজাদারের জন্য সাগরের মাছেরা পর্যন্ত দোয়া করে এবং তা ইফতার পর্যন্ত চলতে থাকে। 
  • রোজাদারের জন্য জান্নাত প্রতিদিন সাজানো হয় অথবা আল্লাহতালা জান্নাতকে বলেন শীঘ্রই আমার নেক বান্দাগণ তাদের দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে তোমার দিকে চলে আসছে ।
  • রমজান মাসে অবাধ্য উশৃংখল শয়তানদেরকে বন্দী করে রাখা হয় যেন তারা মন্দ কাজ পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে। যা পূর্বে কখনই চালু ছিল না ।
  • রমজান মাসে এমন একটি মাস রয়েছে যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম যা পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে ছিল না। সেই রাত্রিটি হলো শবে কদরের রাত্রি।
  • রমজান মাসের শেষ রাতে রোজাদারদের ক্ষমা করে দেওয়া হয় সাহাবীগণ আরজ করলেন তাহলে এটা কি শবে কদর রসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বললেন না বরং নিয়ম এই যে শ্রমিককে মজুরি দেয়া হয় কাজ শেষ করার পরেই। আহমদ বায়হাকী ত্বরগিব

সঠিক ও পরিপূর্ণ রোজা রাখার উপায়

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম একবার খুতবা দেওয়ার জন্য যখন সিঁড়িতে পা দিচ্ছিলেন তখন পরপর তিন সিঁড়িতে তিনবার আমিন বলেছিলেন তন্মধ্যে প্রথম সিঁড়িতে যখন পা রাখেন তখন জিব্রাঈল আঃ বলেছিলেন ধ্বংস হোক ওই ব্যক্তি যে পবিত্র রমজান মাস পেল তবুও সে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ করে নিতে পারল না হুজুরে করীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম তখন আমিন বলেছিলেন। বুখারী শরীফ অতএব স্পষ্ট করে বলা যায় হতভাগা ওই সমস্ত লোক যারা রমজান মাস পেয়েও আল্লাহ তায়ালার রহমত থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত হুজুরে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন রমজান মাসের প্রতি দিন এবং প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা কতক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এমন ভাবে প্রতিদিন এবং প্রতি রাতে প্রত্যেক মুসলমানের কমপক্ষে একটি দোয়া অবশ্যই কবুল হয় ত্বরগিব

যাদের রোজা রাখা না রাখা সমান

অপরপক্ষে কিছু রোজাদার রয়েছে যাদের রোজা রাখা না রাখা সমান। এ সম্পর্কে হাদিস গুলো হলঃ-

হযরত আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত ও রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন "বহু রোজাদার এমন রয়েছে যাদের রোজার কষ্ট ব্যতীত কিছু লাভ হয় না। অনুরূপ বহু রাত জাগরণকারী এমন রয়েছে যাদের রাত জাগরণের কষ্ট ব্যতীত কিছুই লাভ হয় না।" - ইবনে মাজা, নাসাঈ 

অর্থাৎ রোজা রেখেও পাপ কাজ থেকে বিরত হলো না হালাল-মাল দ্বারা ইফতার করল, গীবতে লিপ্ত হলো। অনুরূপভাবে রাত্রে জাগ্রত অবস্থায় কাটালো কিন্তু আনন্দচ্ছলে গীবত করে ফেললো, ফজরের নামাজই হয়তো বা কাজা করে দিল ইত্যাদি ইত্যাদি।

হযরত আবু উবাইদা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লামকে বলতে শুনেছি "রোজা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ যতক্ষণ না সে ঢালকে ফেড়ে ফেলা হয়" - ইবনে মাজা, নাসাঈ 

অর্থাৎ ঢালের সাহায্যে যেমন শত্রু থেকে আত্মরক্ষা করা হয়, তেমনি রোজার সাহায্যেও শয়তানের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু পাপাচারে লিপ্ত হলে রোজার এই ঢালকে নিজেই ফেড়ে ফেলা হলো। 

খাবার খাওয়া, পান করা, কামনা বাসনা থেকে বিরত থাকা মূলত রোজা। এখানে উল্লেখযোগ্য যে এই তিন টি কাজ থেকে বাচা রোজার জন্য জরুরী। বছরের অন্যান্য সময় এই তিনটি কাজ মূলত হালাল। হালাল বোঝা অবস্থায় সব হালাল কাজগুলো থেকে তো বেঁচে থাকতে হয়ই কিন্তু যেসব কাজ পূর্ব থেকে হারাম যেমন মিথ্যা কথা বলা, গীবত করা, চোগলখরি করা ,অসমত দৃষ্টি করা ইত্যাদি এসব পূর্ব থেকে হারাম থাকা সত্ত্বেও রোজা অবস্থায় যদি এগুলো থেকে বেঁচে না থাকা হয় তবে এটা রোজা রাখা না রাখা উভয়ই সমান।

বিভিন্ন ইসলামিক দ্বীনি ব্যক্তিত্ব কুরআন ও হাদিসের নিরীক্ষে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন প্রত্যেক রোজাদার ব্যক্তির অবশ্যই কর্তব্য এগুলোর প্রতি বিশেষভাবে যত্নশীল হয়ে রোজাকে আরো সঠিক পরিপূর্ণ ও ঘাঁটি করে নেওয়া।

চক্ষুর হেফাজতঃ যেন কোন নাজায়েজ জিনিসের প্রতি দৃষ্টি না পড়ে এমনকি রোজা অবস্থায় নিজের বিবির প্রতিও খাহেশাতের দৃষ্টি না করা অনুরোধ খেল তামাশায় ইত্যাদির প্রতি এবং অহেতুক কোন বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত না করা। অনুরূপ খেল তামাশা ইত্যাদির প্রতি এবং অহেতুক কোন বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত না করা।

জবানের হেফাজতঃ মিথ্যা, চোগলখোরী, বেহুদা কথাবার্তা, গীবত, পরনিন্দা, অশ্লীল কথা, ঝগড়া- বিবাদ ইত্যাদি সবকিছু থেকে নিজেকে বিরত থাকা ও বেঁচে চলা। এখানে একটি উল্লেখযোগ্য হাদিস হচ্ছে "তোমার সাথে যদি কারো বাগ-বিতান্ডা, কিংবা ঝগড়ায় লিপ্ত হতে চাই তাহলে তুমি তাকে সালাম দাও এবং বল আমি রোজাদার।"

কানের হেফাজতঃ যাবতীয় নিন্দনীয় বিষয় যা মুখে বলা নাজায়েজ সেগুলোর প্রতি কান লাগানোও নাজায়েজ এবং যথাসম্ভব এগুলো থেকে বেঁচে থাকা অতীব জরুরী। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন "গীবতকারী ও শ্রবণকারী উভয় গুনাহের মধ্যে সমান অংশীদার হয়।" 

শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখাঃ যেমন হাতকে নাজায়েজ বস্তু ধরা থেকে, পা কে নাজায়েজ কাজের দিকে চলা থেকে, পেটকে সন্দেহযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে মুক্ত রাখা ইত্যাদি।

হালাল ইফতারিও পেট ভর্তি করে না খাওয়াঃ কেননা এ দ্বারা রোজার আসল উদ্দেশ্য অর্থাৎ কামশক্তি ও পশু প্রবৃত্তির দমন এবং নূরানী ও আধ্যাত্মিক শক্তিবর্তনের বিষয়টি নষ্ট হয়ে যায়। 

সর্বদায় মনে মনে ভয় রাখা যে, না জানি আমার রোজা কবুল হচ্ছে কি-নাঃ প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক আমলের ব্যাপারেই এই খেয়াল রাখা উচিত যে, আমার দ্বারা এমন কোন ত্রুটি বা অন্যায় হয়ে গেল কি-না যার কারণে আমার আমল আমার মুখের উপর নিক্ষেপ করে দেওয়া হয় যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে-

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম বলেছেন কিয়ামতের দিন 

প্রথমে এক শহীদ ব্যক্তির ব্যাপারে বিচার হবে আল্লাহ তাআলার সামনে হাশরের ময়দানে তাকে পেশ করা হবে এবং তাকে তিনি তার সকল নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। অতঃপর তার এসব নেয়ামতের কথা স্মরণ হয়ে যাবে। অতঃপর আল্লাহতালা তাকে জিজ্ঞেস করবেন তুমি এসব নিয়ামত পাবার পর দুনিয়াতে তার কৃতজ্ঞতা স্বীকারে কি কাজ করেছো? সে উত্তরে বলবে আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য তোমার পক্ষ হতে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, এমনকি শেষ পর্যন্ত আমাকে শহীদ করে দেওয়া হয়েছে। তখন আল্লাহ বলবেন তুমি মিথ্যা বলছো- তোমাকে বীরপুরুষ বলবে এজন্য তুমি লড়াই করেছ আর তা বলাও হয়েছে- তাই তোমার উদ্দেশ্যও সাধিত হয়েছে। তখন তার ব্যাপারে হুকুম দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে হিচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

তারপর দ্বিতীয় ব্যক্তিকে যে নিজে জ্ঞান অর্জন করেছে অন্য কেউ তা শিক্ষা দিয়েছে ও কোরআন পড়েছে তাকে উপস্থিত করা হবে। তাকে দেয়া সব নেয়ামত আল্লাহ তা'আলা তাকে স্মরণ করিয়ে দেবেন। এসব নেয়ামত তার স্মরণ হবে আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন এসব নিয়ামতের তুমি কি শোকর আদায় করেছো? সে উত্তরে বলবে আমি ইলম অর্জন করেছি শিক্ষা দিয়েছি তোমার জন্য কোরআন পড়েছি আল্লাহ তাআলা বলবেন তুমি মিথ্যা বলছো তোমাকে আলিম বলা হবে ক্বারি বলা হবে তাই তুমি এসব কাজ করেছ তোমাকে দুনিয়ায় এসব বলাও হয়েছে। তারপর তার ব্যাপারে হুকুম দেওয়া হবে এবং মুখের ভড়ে উপুড় করে টেনে হিচড়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

এরপর তৃতীয় ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন ধরনের মাল দিয়ে সম্পদশালী করেছেন তাকেও আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাকে দেয়া সব নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এসব তার মনেও পড়ে যাবে। আল্লাহ তাকে এবার জিজ্ঞেস করবেন এসব নিয়ামত পেয়ে তুমি কি আমল করেছ? সে ব্যক্তি উত্তরে বলবে আমি এমন কোন খাতে খরচ করা বাকি রাখেনি যে খাতে খরচ করাকে তুমি পছন্দ করো আল্লাহ তাআলা তার জবাবে বলবেন তুমি মিথ্যা বলছো তুমি খরচ করেছে যাতে মানুষ তোমাকে দানবীর বলে সে খেতাব বা খ্যাতি বা সুনাম তুমি দুনিয়াতে অর্জন করেছো। তারপর তার ব্যাপারে হুকুম দেওয়া হবে এবং তাকেও উপুড় করে টেনে হিচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। মুসলিম

রোজার নিয়ত

সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে পানাহার, নিজ স্তী সহবাস এবং অন্যান্য পাপাচার থেকে বিরত থাকাকে শরিয়াতের পরিভাষায় রোজা বলে। নিয়ত মূলত অন্তরের ইচ্ছা মুখে কিছু বলা হোক আর না হোক শুধু মাত্র মনে মনে চিন্তা করে সংকল্প করা যে আমি আজ আল্লাহর নামে রোজা রাখব এবং কিছু পানাহার বা স্ত্রী ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবো। এতেই রোজা হয়ে যাবে।

কিন্তু কেউ যদি মনের চিন্তা ও সংকল্পের সাথে মুখে ও বাংলায় বা আরবিতে নিয়ত করে "আমি আল্লাহর নামে রোজা রাখার নিয়ত করছি" অথবা "আমি পবিত্র রমজান মাসের আগামী কালকের জন্য রোজা রাখার নিয়ত করলাম"। 

অতএব মনে মনে রোজার নিয়ত করা রোজার পূর্ব শর্ত। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, কোন ব্যক্তি যদি সারাদিন কিছু না খেয়ে বা কিছু পান না করে কাটিয়ে দেই হয়তো তার ক্ষুধায় লাগে নাই অথবা অন্য কোন কারণে সে খাওয়ার সুযোগ পায় নাই। অর্থাৎ পূর্ব থেকেই তার রোজার কোন ইচ্ছা ছিল না। এতে তার রোজার নিয়ত না থাকার কারণে রোজা হবে না বরং এটা তার এমনিতেই উপ্বাস থাকা হয়ে যাবে।

মাসআলাঃ রমজানের রোজার নিয়ত রাত থেকে করণীয় উত্তম কেউ যদি রাতে নিয়ত না করে তবে দিনের বেলায় সূর্য উদয় হবার দেড় ঘন্টা পূর্ব পর্যন্ত নিয়ত করতে পারে তবে শর্ত হলো দিনের বেলায় নিয়ত করার আগ পর্যন্ত কোন প্রকার খানাপিনা খাওয়া যাবেনা। শামী 

মাসআলাঃ শরীয়ত অনুসারে সুবহে সাদিক থেকে রোজা শুরু হয় কাজেই সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত কোন খাবার খাওয়া, পান করা, স্ত্রী ব্যবহার করা ইত্যাদি সব জায়েজ আছে। অনেকে শেষ রাত্রে সেহরি খাওয়ার পর এবং রোজার নিয়ত করার পর রাত্রি থাকা সত্ত্বেও কিছু খাওয়া দাওয়া বা স্ত্রী ব্যবহার নাজায়েজ মনে করেন এটা ভুল। সুবহে সাদিক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নিয়ত করুক বা না করুক এসব জায়েজ আছে। তবে সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা হলে এসব করা যাবে না। বেঃ জেওর 

পবিত্র মাহে রমজানে আমাদের করণীয়

রমজানের লক্ষ্য অর্জন এবং তার শিক্ষাকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে কার্যকর করার জন্য মৌলিক কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিটি রোজাদারকে সে সম্পর্কে অবগত থাকা প্রয়োজন তাই নিম্নের কয়েকটি পরামর্শ সকলের কাছে রাখছি-

  • আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভঃ রমজানের রোজা রাখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথমে সুস্পষ্ট ধারণা  থাকা প্রয়োজন। রোজার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, নিজের আমলের সংশোধন ও পরকালের মুক্তি বা নাজাত। তারপর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে রোজা অবস্থায় আমি আমার হাত, পা, কান, চোখ, জিহবা এবং কল্পনাকেও পাপ-পঙ্কিলতা হতে সাবধান রাখব। আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিধান মত আমার জীবন পরিচালিত করব।
  • কোরআন তেলাওয়াত করাঃ যেহেতু রমজানের সাথে পবিত্র কোরআনের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেহেতু রোজাদারের সম্পর্কও কোরআনের সাথে গভীর হওয়া উচিত। দৈনন্দিন কোরআন তেলাওয়াতের সাথে যেকোনো সূরা বা সূরার অংশ অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ অধ্যায়ন করা উচিত। রমজানের রোজা ও কোরআন মাজিদ কেয়ামতের দিন জাহান্নামের আজাব থেকে নাজাত কামনা করে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে এবং তিনি উভায়ের সুপারিশ গ্রহণ করবেন। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিসে নবী করীম সাঃ বলেন তোমরা কোরআন পাঠ কর কারণ রোজ কিয়ামতে কোরআন তাদের জন্য সুপারিশ করবে। বুখারী 

digital-dream-it

 

  • নামাজ পড়াঃ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রতিটি মুসলমান নর নারীর জন্য ফরজ। অতএব এ ব্যাপারে অবহেলা করার অবকাশ নেই। মুসলমানের প্রধান পরিচয় হলো নামাজ। হাশরের মাঠে প্রথমে নামাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। এই ফরজ নামাজ মসজিদে জামাতে পড়া ওয়াজিব। আহমেদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহ এর মতে জামাত ছাড়া নামাজ কবুল হয় না একা নামাজ পড়ার চেয়ে জামাতের নামাজের সওয়াব ২৭ গুন বেশি। রমজানে জামাতে নামাজ পড়ায় অভ্যস্ত হওয়ার এক বিরাট সুযোগ।
  • তারাবির নামাজঃ তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। রমজান মাসে তারাবির নামাজ জামাতের সাথে আদায়ের প্রথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় হতে প্রচলিত হয়ে আসছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু সালাম এরশাদ করেন ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় যে কিয়ামুললাইল সালাত পড়বে তার অতীতের সকল সগিরা গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। বোখারী ,মুসলিম । এখানে কিয়ামুল লাইল বলতে তারাবি ও তাহাজ্জুদের নামাজকে বুঝানো হয়েছে।
  • ইস্তেগফার করাঃ ইস্তেগফার অর্থাৎ গুনাহ মাফ চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা । এর অপর নাম তওবা। ইস্তেগফারের অনেক ফায়দা রয়েছে যেমন ইস্তেগফারের ফলে রিজিক বৃদ্ধি পায়, বিপদ আপদ, দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, আল্লাহর রহমত আছে, পরিবারের ধন সম্পদের বরকত হয় আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৈনিক ১০০ এর অধিক ইস্তেগফার পড়তেন। তওবা কবুলের জন্য মোট চারটি শর্ত উপস্থিত থাকতে হয় 
      • গুনাকে মন দিয়ে ঘৃণা করা 
      • গুনাহের কাজ সম্পন্ন পরিত্যাগ করা 
      • গুনাহ না করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা 
      • কোন ব্যক্তির অধিকার নষ্ট হলে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে তা মাফ চাওয়া অথবা সেটা তার কাছে ফেরত দেওয়া। আর সেই লোক মারা গেলে অথবা তার কোন সন্ধান পাওয়া না গেলে তার জন্য দোয়া করা। 
এ চারটি শর্ত একসঙ্গে না পাওয়া গেলে তওবা কবুল হয় না বলে আলেম ও শরীয়তের বিশেষজ্ঞদের ঐক্যমত রয়েছে।
  • বেশী বেশী দোয়া করাঃ দোয়া কবুলের বিশেষ সময় দোয়া কবুলের জন্য বিশেষ বিশেষ সময় রয়েছে। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের শেষে দোয়া, আযান ও একামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া, শেষ রাতের দোয়া, ইফতারের সময়ের দোয়া, রোজা অবস্থায় দোয়া, শুক্রবার আসার থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়ের দোয়া ইত্যাদি। তবে হারাম উপার্জনকারী, অবৈধ খাদ্য ভক্ষণকারী এবং জালেমের দোয়া কখনো কবুল হয় না। এছাড়া আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছেদকারীর দোয়াও কবুল হয় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন যদি কেউ অন্য কোন ভাইয়ের ইজ্জতের উপর হামলা করে থাকে অথবা অন্যায় ভাবে তার কোন কিছু নিয়ে থাকে তবে সে যেন সেদিনের আগেই তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়- যেদিন তার পয়সা কড়ি কিছুই কাজে আসবে না।
  • তাহাজ্জুদের নামাজ পড়াঃ আল্লাহর নিকট তাহাজ্জুদের নামাজ অনেক সওয়াব ও ফজিলত রয়েছে। রাতের শেষার্ধে একটি সময় নির্দিষ্ট করে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার চেষ্টা করতে হবে। তিরমিজিতে বর্ণিত হাদিসে নবী করীম সাঃ বলেন "হে লোকেরা সালাম বিনিময়কে প্রসারিত করো। মানুষকে খেতে দাও। আত্মীয়তার বন্ধনকে অটুট রাখো। নিশি রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ (তাহাজ্জুদ) পড়ো। তবে নিরাপদে জান্নাতে যাবে।"
  • কদরের রাত্রি অনুসন্ধান করাঃ রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতসমূহকে কদরের রজনী জেনে সারারাত এবাদতে মগ্ন থাকা উচিত। এ রাতের বহু ফজিলত। যেমন
      • মানবজাতির হেদায়াত কল্যাণের উদ্দেশ্যে পবিত্র কোরআন এর রাতে নাযিল হয় 
      • কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ 
      • রহমতের ফেরেশতাগণ মুমিনদের জন্য কল্যাণ বহন করত এ রাতে দুনিয়া অবতরণ করেন
      • এ রাতে দোযখবাসীদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করা হয় 
      • মোমেন রোজাদারের দোয়া কবুল হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ ১০ দিনের রাতে ঘুমাতেন না। তিনি স্বয়ং জেগে থাকতেন এবং পরিবারের সবাইকে জাগ্রত রাখতেন।
  • এতেকাফ করাঃ শেষ দশ দিন এতেকাফ করা। আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম প্রতি রমজানের শেষ দশ দিন এতেকাফ করতেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে আল্লাহর নবী জীবনের শেষ রমজানে একাধারে ২০ দিন এতেকাফ করেন। দুনিয়ার চিন্তা, ব্যস্ততা ও কাজকর্ম ইত্যাদি থেকে মুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট মাসের শেষ দশ দিন অথবা নয় দিন এতেকাফ করা সুন্নাত। তিন দিন এতেকাফ করা সুন্নাতের খেলাফ।
  • সম্মিলিতভাবে ইফতার করাঃ সকল রোজাদারদেরকে সঙ্গে নিয়ে ইফতার করা। এতে করে নিজেরও অন্য ভাইকে ইফতার করানোর সওয়াব পাওয়া যায়। তবে ওই রোজাদারের সওয়াবে কোন ঘাটতি হবে না। তিরমিজি
  • ওমরা হজ পালন করাঃ শক্তি ও সামর্থ্য থাকলে হারাম শরীফে ওমরা হজ পালন করা। এই ওমরার ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সালাম এরশাদ করেন, "রমজানে ওমরা পালন কারী একটি হজ্জের সওয়াব পাবে। অন্য হাদিসে আমার সাথে হজ্জ করার সওয়াব পাবে বলে উল্লেখ রয়েছে।"
  • রমজানের সদকা আদায় করাঃ রমজানের মধ্যে সদকা ফিতর আদায় করা। ঈদের নামাজের আগে ফিতরা দিতে হবে। বিলম্ব করা মাকরুহ। এ প্রসঙ্গে এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে ফিতরা হচ্ছে রোজাদারের পাপ ও অশ্লীলতার পবিত্রকারি। সেই সাথে এই ফিতরা ফকির ও অভাবীদের জন্য খাদ্যের বস্তু। (আবু দাউদ) অন্য এক হাদিসে তিনি এরশাদ করেন "কোন অভাবগ্রস্ত ভাইয়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা, তার ক্ষুধার যন্ত্রণা দূর করা এবং তাকে পেরেশানি মুক্ত করার ফলে নিজের গুনাহ মাফ হয়।"
  • জিকির করাঃ সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করাকে জিকির বলা হয়। কোরআন ও হাদিসে যে সমস্ত দোয়া উল্লেখ আছে সেগুলো বারবার পড়া। অবসর সময়ে অনর্থক কথাবার্তা না বলে আল্লাহকে ডাকা, তাঁর হামদ, তসবিহ ও তাকবীর উচ্চারণ করা উচিত। রসুলে করিম সাঃ বলেন "আল্লাহর জিকির দ্বারা তোমরা জিহ্বাকে সিক্ত রাখো।"
  • মৃত্যুকে স্মরণ করাঃ সবার মত আমাকেও এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে এবং পরকালে আমার কৃতকর্মের হিসাব নিকাশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দিতে হবে। পরকালে যাত্রার জন্য আমার হাতে কোন সম্বল পর্যাপ্ত কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। মৃত্যুর স্মরণ থাকা অবস্থায় মানুষ পাপে লিপ্ত হতে পারে না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করতে বলেছেন।
  • নিজ কাজকর্মের সার্বিক মূল্যায়ন করাঃ মাহে রমজানের শেষ পর্যায়ে নিজ কাজকর্মের সার্বিক মূল্যায়ন করতে হবে। এ মাসে কতটুকু নেক আমল করা সম্ভব হলো আর কতটুকু সম্ভব হয়নি তার হিসাব নিয়ে- দুর্বলতা ও অন্যায়ের জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে নিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে একই অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি না হয় সে জন্য প্রতিজ্ঞা করতে হবে। যতটুকু সৎ আমল করা সম্ভব হয়েছে তার জন্য আল্লাহর কাছে শুোকর গুজার করতে হবে।

রোজা ভঙ্গ করার শাস্তি  

সুস্থ ও সামর্থ্য থাকা সত্বেও রমজানের ফরজ রোজা ভঙ্গ করার পরিনিতি খুবই ভয়াবহ। একটি রোজার ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে সারা বছর একাধারে রোজা রাখলেও তার ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়। বুখারী এক হাদিস হতে বর্ণিত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু বলেছেন ইসলামের মূল ভিত্তি তিনটি খুটির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে একটি যদি কেউ বাদ দেয় সে কাফের হয়ে যাবে এবং তাকে হত্যা করা বৈধ। 
মূল ভিত্তি তিনটি হলঃ-
  • কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করা ও পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখা
  • ওয়াক্ত মত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ও 
  • রমজানের রোজা রাখা (দাইলামি)
ইমাম জাহাবি এটাকে সহিহ হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মাহে রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং আমাদের করণীয়ঃ পরিশেষ

মাহে রমজানের গুরুত্ব ও আমাদের কর্তব্যের সংক্ষিপ্ত আলোচনাকে বাস্তবেরূপ দেয়ার চেষ্টা করা সবার জন্য অতীব প্রয়োজন। তবেই আমার সাধনা সফল হয়েছে বলে মনে করব। রমজানের শিক্ষার আলোকে জীবনের বাকি দিনগুলো পরিচালনার ব্যাপারে মহান আল্লাহর সাহায্য সঙ্গে না থাকলে আমাদের পক্ষে মোটেই কিছু করা সম্ভব নয়। আর যদি সংশোধনের ও ভালো হয়ে চলার উদ্দেশ্যকে ভুলে যাওয়া হয় তবে রমজানের রোজা, সারাদিন ও সারারাতের এবাদত, মেহনত, কষ্ট ও চেষ্টা সবই বরবাদ হয়ে যাবে। তাই আসুন রমজানের উপরোক্ত আলোচনাকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে আমাদের জীবনকে পরকালমুখী করে তুলি। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন আমীন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url