যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ ও মাকরুহ হয়

সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য নেকি অর্জনের এবং নিজেকে পুতপবিত্র করার আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের বছরের অন্যতম সেরা মাস রমজান মাস চলছে। যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ অত্যন্ত ভাবগম্ভীর্যের মাধ্যমে পবিত্র রমজান মাসের রোজা পালন করছে। 

digital-dream-it

 

কিন্তু কি কি কারণে রোজার পবিত্রতা নষ্ট হয় বা রোজা ভঙ্গ হয়ে যায় বা রোজা ভঙ্গ হয় না তা অনেকের কাছে অজানা। আজকের নিবন্ধে আমরা আজ এই বিষয়েই পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

সূচীপত্রঃ রোজা ভঙ্গের কারনসমুহ কি কি

    মাহে রমজানের গুরুত্ব ও ফরজ হওয়ার দলিল

    পবিত্র মাহে রমজানের পরিপূর্ণ মহাত্যা হাসিল করতে হলে রমজান মাসকে পরিপূর্ণভাবে পালন করতে হবে বা রোজার হক আদায় করতে হবে। আমরা যদি সারাদিন না খেয়ে থাকি মিথ্যা কথা বলা, হারাম খাওয়া, চোগলখুরি করা, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করা ইত্যাদি হারাম ও অবৈধ কাজ থেকে বিরত থাকতে না পারি তবে রমজান মাসে শুধুমাত্র না খেয়েই থাকা হবে। রমজানের পবিত্র উদ্দেশ্য হাসিল হবে না। 

    সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য রমজান মাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মহিমান্বিত রাত। প্রকৃত মুসলমানদের জন্য রমজান মাস ত্যাগের ও আত্মশুদ্ধির মাস। আল্লাহ ভীতি অন্তরে কাজ করাই এ মাসে প্রকৃত মুসলমানগণ সিয়াম পালনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পারে। 

    সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে পবিত্র রমজান মাসের রোজাকে ফরজ করার নির্দেশ ও এর প্রকৃত মহাত্য অর্জন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআন শরীফের এই আয়াতে বলা হয়েছে "তোমাদের উপর রমজান মাসের রোজাকে ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের প্রতি, যেন তোমরা তাকওয়া বা পরহেজগারিতা অর্জন করতে পারো।"

    যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়

    • ইসলাম ত্যাগ করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
    • কানে বা নাকে ওষুধ এবং তেল ঢাললে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং পরে এর কাজা আদায় করতে হবে।
    • পায়খানার রাস্তায় ডুস নিলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং পরে এর কাজা আদায় করতে হবে।
    • রোজা অবস্থায় পেশাবের রাস্তায় কোন ঔষধ বা তেল ঢোকানো এরূপ করলেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং কাজা আদায় করতে।
    • দাঁত দিয়ে রক্ত বের হওয়ার পর থুতুর সঙ্গে সে রক্ত গিলে ফেললে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং কাজ আদায় করতে হবে। কিন্তু রক্ত যদি থুতুর চেয়ে কম হয় অর্থাৎ এতে রক্তের স্বাদ পাওয়া না যায় তবে রোজা ভঙ্গ হবে না।
    • ভুলে খাওয়া দাওয়া করে ফেললে রোজা নষ্ট হয় না কিন্তু এরূপ করার পর রোজা ভঙ্গ হয়ে গেছে মনে করে যদি আরো কিছু খাওয়া হয় ,তবে অবশ্যই রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং কাজা আদায় করতে হবে।
    • এখনো রাত আছে, সুবহে সাদিক হয় নাই মনে করে যদি সেহরি খাই এবং পরে জানতে পারে যে, ঐ সময় রাত ছিল না, তবে ঐ রোজা সহীহ হবে না।এমন অবস্থায় রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
    • এমনিভাবে সূর্য ডুবে গেছে মনে করে যদি ইফতারও করে ফেলে পরে জানতে পারে যে সূর্য ডুবে নাই তবে ওই রোজাও সহীহ হবে না। এমন অবস্থাতে রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
    • সুরমা অথবা তেল লাগিয়ে অজ্ঞতবশত যদি কেউ মনে করে যে, তার রোজা ভেঙ্গে গেছে এবং এই কারণে ইচ্ছা করে কিছু খাওয়া দাওয়া করে, তবে কাজাও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হবে।
    • আগরবাতি জ্বালিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ওইগুলোর দোয়া গ্রহণ করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
    • বিড়ি, সিগারেট বা হুক্কার ধোয়া পান করলেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। আতর ,ফুলের ঘ্রাণ ইত্যাদির ঘুষবুতে রোজা ভঙ্গ হয় না।
    • গ্লুকোজ বা শক্তিবর্ধক ইনজেকশন বা স্যালাইন আইভি / ইনস্ট্রাভেনাস মাধ্যমে নিলেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
    • দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার খেয়ে ফেললে এবং জিহ্বার দ্বারা বের করে মুখ থেকে বাইরে না এনে গিলে ফেললে যদি ওই খাদ্যদ্রব্য একটি বুটের পরিমাণ অথবা এর বেশি হয়, তবে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং এর কাজা আদায় করতে হবে। আর যদি একটি বুট অপেক্ষা কম হয় তবে রোজা ভঙ্গ হবে না। আর যদি মুখ থেকে বাইরে এনে তারপর গিলা হয়, তবে তা একটি বুটের পরিমাণের চেয়ে কম হলেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং কাজা করতে হবে, কাফফারা নয়।
    • সেহরি খেয়ে পান মুখে দিয়ে চিবাতে চিবাতে ঘুমিয়ে পড়লে এবং পান মুখে থাকা অবস্থায় সকাল হয়ে গেলে ঐ রোজা শুদ্ধ হবে না। পরবর্তীতে একটি রোজা কাজা করতে হবে।
    • কুলি করার সময় গলার ভিতর পানি চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে--রোজার কথা স্মরণ থাকুক বা না থাকুক। এ রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
    • ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর অল্প বমি করলে রোজা ভঙ্গ হবে না।
    • যদি বৃষ্টির পানি মুখের মধ্যে পড়ে এবং তার খেয়ে ফেলা হয় তবেও রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
    • যদি একটি কংকর অথবা একটি লোহার অথবা সীসার গুলি অথবা এমন কোন জিনিস গিলে ফেলা হয় যা সাধারণত মানুষজন খাবার রূপেও খায় না এবং ওষুধ রুপেও সেবন করে না, তবে এতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং একটি রোজা কাজা করতে হবে। আর যদি এমন হয় কোন জিনিস গিলে ফেলা হয়, যা লোকে খাবার  বা পানীয়রূপে পান করে কিংবা ওষুধ রূপে সেবন করে তবে ঐ রোজার কাজা এবং কাফফারা উভয়টিই দিতে হবে।
    • রোজা রেখে দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস করলে এমনকি খাতনা স্থান প্রবেশ করলেও বীর্যপাত হোক বা না হোক রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং কাজা ও কাফফারা উপায়ই ওয়াজিব হবে।
    • প্রসূতির প্রসাব দ্বারে ধাত্রী আঙ্গুল ঢুকিয়ে কিংবা নিজেই নিজের যোনিতে আঙ্গুল ঢুকিয়ে অতঃপর সম্পূর্ণ আঙ্গুল কিংবা আংশিক অংশ বের করার পর আবার যদি ঢুকায় তবে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। আর যদি বের করার পর আবার না ঢুকানো হয় তবে রোজা ভঙ্গ হবে না। অবশ্য পানি, তেল ইত্যাদি দ্বারা আঙ্গুল আগে থেকেই ভিজিয়ে থাকলে প্রথমবার ঢোকানোর দ্বারায় রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
    • স্ত্রীকে হাত লাগানো বা পেয়ার করার দরুণ বীর্যপাত হয়ে গেলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং কাজা আদায় করতে হবে।
    • রমজান মাসে কোন কারণবশত রোজা ভঙ্গ হয়ে গেলে দিনের বেলায় কিছু খাওয়া-দাওয়া বৈধ নয় সমস্ত দিন রোজাদারের ন্যায় না খেয়ে থাকা ওয়াজিব।

    যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না মাকরুহ হয়

    • জিব্বার অগ্রভাগ দিয়ে কোন জিনিসের শুধু একটু স্বাদ দেখে থুতু ফেলে দিলে রোজা ভঙ্গ হয় না কিন্তু বিনা দরকারে এরূপ করা মাত্র অবশ্য কারো স্বামী যদি জালেম পাষাণ হৃদয় হয় যে তরকারিতে লবণ একটু কম বা বেশি হলে জুলুম শুরু করে তবে এরূপ করা মাত্র নয়।
    • রোজা অবস্থায় শিশুর খাবার জন্য কিছু চিবিয়ে দেওয়া হলে এবং অন্য কেউ চিবিয়ে দেয়ার মত না থাকলে চিবিয়ে দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে ফেলার জায়েজ আছে
    • রোজা রেখে দিনের বেলায় স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে শোয়া, হাত লাগানো, মহব্বত করা এতে যদি কাম ভাব প্রবল হয়ে সহবাস করা হয় তবে এরূপ করা মাকরুহ।
    • রাতে গোসল ফরজ হলে শুভেচ্ছা দিকের পূর্বেই গোসল করে নেয়া উচিত কিন্তু গোসল করতে দেরি করলে কিংবা সারা দিন গোসল না করলে যদিও রোজা ভঙ্গ হবে না কিন্তু অকারণের দেরী করার জন্য পৃথক গোনা হবে
    • রোজা অবস্থায় কয়লা, মাজন, ছাই, বালু, টুথপেস্ট দ্বারা দাঁত মাজা মাকরুফ এর কিছু অংশ যদি কুপের নিচে চলে যায় তবে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
    • শিঙ্গা লাগানো রোগীর জন্য নিজের রক্ত দেওয়া যা আজকাল ডাক্তারগণের মধ্যে প্রচলিত এবং এটি মাত্র 
    • গীবত অর্থাৎ পরনিন্দা সর্ব অবস্থায় হারাম রোজা অবস্থায় আরো কঠিন গুনাহ হবে
    • রোজা অবস্থায় ঝগড়া বিবাদ করা গালি দেওয়া কোন মানুষকে গালি দেওয়া থেকে হোক কিংবা কোন প্রাণী বা নিষ্প্রাণ বস্তুকে এ দ্বারা রোজার মাকরুহ হয়ে যাবে

    যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না মাকরুহও হয় না

    • রোজা রেখে দিনে ঘুমাইলে ও স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভঙ্গ হয় না।
    • চোখে সুরমা লাগানো বা ওষুধ ব্যবহার করা অথবা মাথায়, চুলে দাড়িতে বা শরীরে তেল লাগানো অথবা খোশবুর ঘ্রাণ লওয়া জায়েজ আছে। এমনকি চোখে সুরমা লাগানোর পর যদি থুথু কিংবা শ্লেষার সাথে সুরমার রং দেখা যায় তবুও রোজা ভঙ্গ হয় না ,মাকরুহও হয় না।
    • মুখে থুতু যত বেশিই হোক না কেন তা গিলে ফেললে রোজার কোনই ক্ষতি হয় না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে অনেকক্ষণ ধরে কিছু জমিয়ে রেখে তা গিলে ফেললে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
    • সেহরি খাওয়ার পর পান খাওয়া হলে সুবেহ সাদিকের পূর্বেই উত্তমগুলি করে মুখ পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত। এরপরও যদি সকালে থুতুতে কিছু লাল দেখায় তবে এতে রোজা ভঙ্গ হবে না।
    • রোজা রেখে যদি শরীরে বা মাথায় তেল ব্যবহার করা হয় তবে রোজা ভঙ্গ হয় না। অনুরূপভাবে রোজার দিনে যদি চুল, গোফ বা নখ কাটা হয় তবেও রোজার কোন ক্ষতি হবে না।
    • সুস্থ অবস্থায় রোজা রাখার নিয়ত করেছেন রোজাও আছেন এমন অবস্থায় যদি আপনি অজ্ঞান বা অচেতন হয়ে যান তাতেও রোজার কোন ক্ষতি হবে না বা রোজা নষ্ট হবে না।
    • রোজা অবস্থায় ইনজেকশন বা টিকা নিলে রোজা নষ্ট হয় না।
    • নাকের প্লেসা হলকুফের ভিতর চলে গেলে রোজা নষ্ট হয় না।
    • রোজার কথা ভুলে গিয়ে কিছু খেয়ে ফেললে কিংবা সহবাস হয়ে গেলে রোজার কথা যদি একেবারেই মনে না আসে তবে রোজা ভঙ্গ হয় না। কিন্তু খাওয়া শুরু করার পর স্মরণ হলে তৎক্ষণাৎ বন্ধ করতে হবে। স্মরণ হওয়ার পর সামান্য কিছু খেলেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
    • আপনা আপনি বমি হয়ে গেলে সেটা বেশি হোক কিংবা কম হোক এতে রোজা নষ্ট হয় না। একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি করবে তার কাজা আদায় করতে হবে না আবু দাউদ ১২৯৪।
    •  আপনা আপনি সামান্য বমি আপনা আপনি হল কুপের ভিতর চলে গেলেও রোজা নষ্ট হয় না। অবশ্য যদি ইচ্ছা পূর্ব গিলা হয় তাহলে কম হলেও রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। অথবা যদি বেশি পরিমাণে আপনা আপনি হলকূপের নিচে চলে যায় তবে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
    • কানে পানি ঢুকালে রোজা ভঙ্গ হয় না।
    • কাঁচা বা শুকনা মিশওয়াক দ্বারা দাঁত মাজার নিয়ম আছে। এমনকি নিমের কাঁচা ডালের দ্বারাও যদি মিসকল করা হয় এবং এর তিক্ততার স্বাদ অনুভব করা হয় এতেও রোজার কোন ক্ষতি হবে না মাকরুহ ও হবেনা
    • রোজা রেখে মুখে গুল ব্যবহার করা মাকরুহ যদি গুলের কিছু অংশ ভিতরে চলে যায় তাহলে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
    • নাইট্রো গ্লিসারিন জাতীয় ইনহেলার নিলে রোজা ভাঙবে না কিন্তু যদি ভেনট্রোলিন জাতীয় ইনহেলার রোজা অবস্থায় নেয়া হয় তবে রোজা ভেঙ্গে যাবে কারণ এর কিছু অংশ খাদ্যনালীতে চলে যায়।
    • রোজা রেখে মিথ্যা কথা বলা, পরনিন্দা বা পরচর্চা করা অথবা ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়ে গেলে  রোজা মাকরুহ হয়ে যাবে।
    • নাচ গান সিনেমা দেখা বা যৌন উত্তেজনা পূর্বক কোন কিছু দেখা ও শোনা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে নয়তো রোজা মাকরূহ হয়ে যাবে

    যে অবস্থায় রোজা রেখেও ভাঙ্গা যায়

    রমজানের রোজা রাখা প্রত্যেক মুমিনের জন্য ফরজ। এটি ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সবল ও সুষ্ঠ মুমিনের জন্য পবিত্র রমজান মাসের রোজা রাখা ফরজ।

    "আল্লাহ দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কষ্ট চাপিয়ে দেন নাই" সূরা হজ্জ -৭৮ ।

    • রোজা অবস্থায় যদি এমন কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে যে কিছু খাওয়া-দাওয়া বা পানি না খেলে জীবনের আশঙ্কা হতে পারে বা রোগ অত্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যেমন হঠাৎ পেটে ব্যথা দেখা দিল এবং একেবারে অস্থির করে ফেলল, সাপে দংশন করলো ওষুধ না খেলে প্রাণনাশ হতে পারে-এরকম অবস্থা রোজা ছেড়ে দিয়ে ওষুধ সেবন করা জায়েজ আছে।
    • যদি এমন ভীষণ পিপাসা হয় যে প্রাণনাথের আশঙ্কা আছে তবে রোজা ভাঙ্গা জায়েজ আছে।

    যেসব কারণে রোজা না রাখার অনুমতি আছে

    ইসলামী শরীয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল মানুষ যেন ইসলামী বিধি বিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে কোন ধরনের ক্ষতি বা কষ্টের মধ্যে না পড়ে। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে "তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ বা সফরে থাকে সে যেন অন্য সময়ে এই সংখ্যা পূরণ করে নেই।" সূরা বাকারা ১৮৪। শরীয়ত বিভিন্ন কারণে রোজাদার ব্যক্তির রোজা ভঙ্গ করার হুকুম দিয়েছে। যেসব কারণে রোজা ভেঙ্গে ফেলা জায়েয নিম্নে তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলোঃ-

    • এমন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যে রোজা রাখলে তার রোগ বেড়ে যাবে কিংবা রোগ দূরারোগ্য হয়ে যাবে কিংবা মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তার জন্য রোজা না রেখে সুস্থ হওয়ার পর কাজা করা নিয়ম আছে।  কিন্তু নিজের কাল্পনিক খেয়ালে রোজা ছেড়ে দেওয়া জায়েজ হবে না। মুসলমান দ্বীনদার অধ্যাপক, গবেষক ও চিকিৎসকের সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে।
    • আরোগ্য হওয়ার পর দুর্বল অবস্থায় রোজা রাখলে যদি পুনরায় রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তবে তখন রোজা না রেখে পরে কাজা করা জায়েজ আছে।
    • যারা শরীয়ত অনুসারে মুসাফির, তারা সফরে থাকাকালীন রোজা না রেখে অন্য সময় রোজা রাখতে পারেন। যে ব্যক্তি ৪৮ মাইল বা তদূর্ধ্ব দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার ইচ্ছা করে নিজ বাসস্থানের সীমা অতিক্রম করেছে  তাকে মুসাফির বলে।
    • সফরে কষ্ট না হলে রোজা রাখাই উত্তম। তবুও যদি না রাখে পরে কাজা করলে গোনাহগার হবে না, অবশ্য রমজানের ফজিলত সে আর পাবে না।
    • সফরে বের হওয়ার পর বিদেশে কোন স্থানে ১৫ দিন বা এর বেশি অবস্থান করার নিয়ত করলে সে মুসাফির থাকে না। মুকিম হয়ে যায়। সুতরাং মুকিম অবস্থায় তাকে অবশ্যই রোজা রাখতে হবে।
    • গর্ভবতী মেয়ে লোক অথবা সদ্যপোষিত শিশুর স্তন্যদায়গনীদের রোজা রাখলে যদি নিজের বা শিশুর জীবনের আশঙ্কা হয়, তবে তার জন্য রোজা না রাখার নিয়ম আছে।
    • মেয়ে লোকের যদি রোজার মধ্যে হায়েস বা নিফাস উপস্থিত হয়, তবে এ অবস্থায় রোজা রাখার নিয়ম নেই। পরে কাজা আদায় করে নিতে হবে।
    • রাতে যদি মেয়ে লোকের হায়েয বন্ধ হয় তবে সকালে রোজা ছাড়বে না। যদি রাতে গোসল নাও করে থাকে তবুও রোজা রেখে দিতে হবে এবং সকালে গোসল করে নেবে। আর যদি শুবহে সাদিক হওয়ার পর রক্ত বন্ধ হয়, তবে রোজার নিয়ত করা জায়েজ হবে না। অবশ্য দিনভর কিছু পানাহার না করে, রোজাদারের মত থাকবে।
    • কোন মহিলা যদি ঋতুরোধক ঔষধ সেবন করে স্রাব বন্ধ রেখে রমজান মাসে রোজা পূর্ণ করে, তবে স্বাস্থ্যের জন্য কোনরূপ ক্ষতির কারণ না হলে এরূপ করা যদিও নাজায়েজ হবে না। কিন্তু বড় কোন ওজর বা প্রয়োজন না থাকলে আল্লাহর দেয়া স্বাভাবিক বিধানই যথাযথ নিয়ম মেনে সে অনুযায়ী আমল করার মধ্যেই বরকত রয়েছে। এক্ষেত্রে রমজানের পর কাজা করলে রমজানের রহমতে বা বরকত থেকেও সে মাহরুম হবেনা।
    • সফরের কারণে রোজার নিয়ত করে নাই কিন্তু দুপুরের ১ ঘণ্টা পূর্বে কোন স্থানে ১৫ দিন অবস্থানের নিয়ত করল এবং এখন পর্যন্ত সে কিছু পানাহার করে নাই। এমতাবস্থায় তার ওই সময় রোজার নিয়ত করতে হবে।
    • রোজার নিয়ত করার পর যদি সফর শুরু করা হয়, তবে রোজাটি ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নেই। এমনইভাবে সকাল বেলায় সফরে যাওয়া হবে সেজন্য রোজার নিয়ত না করা জায়েজ নয়। এমনিভাবে, মুসাফির রোজার নিয়ত করে থাকলে তার জন্য ঐ রোজাটি ছাড়া জায়েজ নয়।
    • এমন নারী অথবা পুরুষ যারা শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল বা সামর্থ্য নয় তাদের রোজা রাখার ব্যাপারে ইসলাম ছাড় দিয়েছে। এমন অবস্থায় রোজা কাজা করা যাবে এবং কাজা আদায় করতে না করলে তারা কাফফারা আদায় করবে। 
        • কোরআনে বর্ণিত হয়েছে "রোজার কারণে যাদের খুব বেশি কষ্ট হয় তাদের কর্তব্যের পরিবর্তে একজন অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দান করবে।" সূরা বাকারা ১৮৪ নম্বর। 
        • এ সম্পর্কে একটি হাদিস হচ্ছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত আয়াতটি এখনো রোহিত হয়নি এমন বৃদ্ধ পুরুষ ও নারী যাদের রোজা রাখার সমর্থ নেই তারা প্রতিদিনের পরিবর্তে একজন অভাবগ্রস্তকে খাবার খাওয়াবে। তাফসীর ইবনে কাসির।
    • বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে বা বিশেষ প্রয়োজন পূরণ করাতে কখনো কখনো রোজা না রাখার অবকাশ রয়েছে। যেমন পানিতে ডুবে যাওয়া, আগুনে পোড়া, ফসল কর্তন করার ক্ষেত্রে। (যদি রোজা থাকার কারণে ফসল কর্তন করতে দেরি হয় এবং যাতে ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তখন রোজা কাজা করা যাবে ভেঙ্গে দেয়া যাবে) ইত্যাদি বিশেষ মুহূর্তে ব্যক্তির চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপার খুব জরুরী হয়ে পড়ে অথবা ফসল সংগ্রহ করতে না পারলে দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতএব এ ব্যাপারে রোজা ভঙ্গের নির্দেশ রয়েছে। 
    এক্ষেত্রে আবু সাঈদ ক্ষুদ্রি রাযিআল্লাহু হতে বর্ণিত একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে রোজা রেখে মক্কার উদ্দেশ্যে সফর করছিলাম আমরা পথিমধ্যে এক জায়গায় যাত্রা বিরতি দিলাম তখন হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বললেন তোমরা শত্রুদের খুবই নিকটবর্তী হয়েছো রোজা ভঙ্গ করাই তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবে। সহীহ মুসলিম ১১২০

    যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ বা মাকরুহ হয় । শেষ কথাঃ 

    আসুন আমরা সবাই রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করি। রমজানে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করি কারণ রমজানের গুরুত্ব হয়েছে এ মাসে পবিত্র কোরআন নাজিল হওয়ার কারণে। সুতরাং রমজানে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করার মাধ্যমে এর অর্থসহ ব্যাখ্যা পড়ি যেন আমরা আমাদের জীবনের বছরের অন্যান্য সময়ে তা যথাযথভাবে পালন করতে পারি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কবুল করুন আমীন।

    এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

    পরবর্তী পোস্ট দেখুন
    এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
    মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

    এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

    comment url